কক্সবাজার! নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সীমাহীন সমুদ্র, ঢেউয়ের গর্জন আর লক্ষ-লক্ষ মানুষের কোলাহল। কিন্তু এই কক্সবাজারের নামের পেছনে যে গল্পটা লুকিয়ে আছে, সেটা কি আপনি জানেন? গল্পটা ১৭৯৯ সালের। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন, নাম হিরাম কক্স। তখনকার বার্মা, অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার আরাকানি শরণার্থীকে পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। তিনি এখানে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয়রা ভালোবেসে এর নাম দেয় “কক্স সাহেবের বাজার”। সেই থেকেই আজকের এই ‘কক্সবাজার’।
কিন্তু তারও আগে এই জায়গাটার একটা ভিন্ন নাম ছিল। রাখাইনরা একে ডাকত ‘পানোয়া’ বা ‘হলুদ ফুলের দেশ’ বলে। কারণ পুরো এলাকাটা তখন ঢেকে থাকত বুনো হলুদ ফুলে। কী অসাধারণ দৃশ্য, তাই না? এই রাখাইন সম্প্রদায় তাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর জীবনযাত্রা দিয়ে কক্সবাজারকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। তাদের হাতে বোনা কাপড়, জলকেলি উৎসব, এসব কিছুই আমাদের পর্যটন শিল্পের এক অমূল্য সম্পদ।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, কক্সবাজারের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্য বা এর ভেতরের সৌন্দর্য আমরা ক’জনই বা জানি? আমাদের পর্যটন কি শুধু সমুদ্র দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে? শুধু কক্সবাজার নয়, আমাদের আছে পার্বত্য অঞ্চলের মেঘে ঢাকা সবুজ পাহাড়। যেখানে মেঘেরা আপনার পায়ের নিচে খেলা করে। আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্বিত বিচরণভূমি, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। তাছাড়া হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতার চিহ্ন, বগুড়ার মহাস্থানগড় কিম্বা কুমিল্লার ময়নামতি। ভাবুন তো, এই মাটির নিচেই ঘুমিয়ে আছে হাজার বছরের পুরনো পুণ্ড্রবর্ধনের মতো এক সমৃদ্ধ নগরী!
আর দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের কথা কী বলব! শীতের মেঘমুক্ত সকালে সেখানে আকাশে উঁকি দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কিন্তু আক্ষেপটা অন্য জায়গায়, বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বন আর হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য থাকার পরও পর্যটন শিল্পে কেন আমরা পিছিয়ে, বলতে পারেন?
বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেরই প্রিয় ট্রাভেল ডেসটিনেশন থাইল্যান্ড। ২০২৪ সালে দেশটিতে বিদেশি পর্যটক এসেছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ। সেখানে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা মাত্র কয়েক লাখ। ২০১৯ সালে দেশে ছয় লাখের বেশি বিদেশি পর্যটক এলেও গত দুবছর এটি লাখ ছাড়াতে পারেনি। পার্থক্যটা বিশাল। কিন্তু কারণটা কী?
থাইল্যান্ড তাদের পর্যটনকে একটা শিল্প হিসেবে গড়ে তুলেছে, আছে “Amazing Thailand” এর মতো বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডিং। পর্যটকদের জন্য উন্নত অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় তারা। সম্প্রতি ট্যুরিজ্ম সেক্টরে উন্নয়ের জন্য ফ্রি ভিসা নীতি গ্রহণ করেছে বিদেশি টুরিস্টের জন্য! থাইল্যান্ডের সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের জন্য আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। যেমন, বাথরুম, গোসলের জন্য জায়গা এবং চেঞ্জিং রুম। সেখানকার সৈকতগুলোতে পানি আর বালিতে সময় কাটানোর পর পর্যটকরা সহজেই নিজেদের পরিষ্কার করে নিতে পারে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার পর্যটন এলাকায় এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
আমাদের কক্সবাজারেও এমন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। সৈকতের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে উন্নত মানের চেঞ্জিং রুম, বাথরুম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এই সাধারণ সুবিধাগুলো যোগ করলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আরও সহজে এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কক্সবাজার উপভোগ করতে পারবে। ছোট এই পরিবর্তনগুলোই কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করতে সাহায্য করবে এবং এর আকর্ষণ বহুগুণে বাড়িয়ে তুলবে বলে আমার বিশ্বাস।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া সত্যিকার অর্থেই এশিয়া ব্যান্ডিংয়ে তাদের বহুসাংস্কৃতিক আকর্ষণ আর পারিবারিক পর্যটনকে পুঁজি করেছে। তাদের টুইন টাওয়ারের মত সুউচ্চ ভবন আর লেগোল্যান্ড বা সানওয়ে লেগুনের মতো থিম পার্কগুলো সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে পরিচিত। আর হিমালয় কন্যা নেপাল? তাদের মূল শক্তি হলো অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। বিভিন্ন চূড়ায় আরোহণের স্বপ্ন নিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর নেপালে পাড়ি জমান। তারা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
আর বাংলাদেশে ভাঙাচোরা রাস্তা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ আর মানসম্মত হোটেলের অভাব ট্যুরিজম সেক্টরে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তার ওপর নিরাপত্তার অভাব তো আছেই। প্রতি বছর পানিতে ডুবে, পাহাড়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় বহু পর্যটকের মৃত্যু হয়। যেখানে নিজেদের দেশের পর্যটকদেরই নিরাপত্তা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি, সেখানে বিদেশি পর্যটকরা আস্থা পাবে কীভাবে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে তুলে ধরার মতো কার্যকর কোনো ব্র্যান্ডিং আমাদের নেই। “Beautiful Bangladesh” স্লোগানটি থাকলেও এর প্রয়োগ একেবারেই সীমিত।
অনেক দেশের পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে আসার ভিসা প্রক্রিয়া এখনও বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তার সাথে রয়েছে আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর চরম অব্যবস্থাপনা। প্রবেশ ফি নেওয়া হলেও পর্যটকদের সুবিধার জন্য সেই পয়সাও কি খরচ করা হয়? আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, তাহলে আমাদের সরকারি সংস্থাগুলো কি কিছুই করছে না? বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, ট্যুরিজম বোর্ড, এদের ভূমিকা আসলে কী?
অবশ্যই কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয় পর্যটন খাতে বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির জন্য। ২০১০ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, যার মূল কাজ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা। কিন্তু তারা কি সেটা করছে? দেশের অভ্যন্তরে কিছু দিবস উদযাপন আর অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ট্যুরিজম ব্রান্ডিংয়ের দায়িত্ব পাওয়া ট্যুরিজম বোর্ড। আর এসব কারণেই ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে আমরা বলি অপার সৌন্দর্যের বাংলাদেশে তারপরও বছরে এক লাখ পর্যটকও আমরা আকর্ষণ করাতে পারিনা।
সম্প্রতি সরকার ২৫ বছর মেয়াদী একটি জাতীয় পর্যটন মাস্টার প্ল্যান অনুমোদন করেছে। কক্সবাজারে তৈরি হচ্ছে সাবরাং ও নাফ ট্যুরিজম পার্কের মতো বড় প্রকল্প। পদ্মা সেতু চালুর পর কুয়াকাটা ও সুন্দরবন ভ্রমণ সহজ করতে বিশেষ ট্যুর প্যাকেজও চালু হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই উদ্যোগগুলো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন।
তাহলে সমাধান কী? নেপাল যদি তাদের পাহাড়কে কাজে লাগিয়ে সফল হতে পারে, আমরা আমাদের সমুদ্র, বন আর ইতিহাসকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ক্ষেত্রে কেন উন্নতি করতে পারব না? প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড এবং রেসকিউ টিম মোতায়েন করতে হবে। আবহাওয়া অনুযায়ী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। রাস্তাঘাট মেরামত, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুবিধা তৈরি করতে হবে। তাছাড়া পার্বত্য এলাকায় প্যারা গ্লাইডিং এবং সমুদ্রে প্যারা সেইলিং আর মাঝ সমুদ্রের নিরাপদ স্থানে স্নোরকলিং বা সমুদ্র স্নান করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে ঔই স্থানের উপযোগি বিনোদণের ব্যবস্থা হলে পর্যটক আসবেই। আমার বিশ্বাস প্রতিটি পর্যটন এলাকায় নাইট মার্কেট হলে বিদেশি পর্যটকদের জন্য যেটি হবে বিনোদনের উপলক্ষ্য। অন্যদিকে দেশীয় পণ্য ও সেবা পৌঁছে যাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
ডিজিটাল মার্কেটিং এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা দরকার। প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ করতে হবে। স্থানীয় গাইডদের ইংলিশ স্পিকিং কোর্স বাধ্যতামূলক করে, নিশ্চিত করতে হবে লাইসেন্স ট্যুরিস্ট গাইড। হোটেল ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ লোকবল তৈরি করতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়তে হবে। আর সবার আগে প্রয়োজন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি।
পর্যটক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব আছে। সাঁতার না জেনে গভীর পানিতে না নামা, পানিতে নামালে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরা, স্থানীয়দের নির্দেশনা মেনে চলা, এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই বড় দুর্ঘটনা থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। আমাদের এই সুন্দর দেশটার সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকার যেমন আমাদের আছে, তেমনি একে নিরাপদ রাখার দায়িত্বটাও আমাদের সবার। সরকার, প্রশাসন এবং পর্যটক, আমরা সবাই মিলে যদি একযোগে কাজ করি, তবেই আমাদের পর্যটন কেন্দ্রগুলো আর মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকবে না। হয়ে উঠবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক নিরাপদ ও আকর্ষণীয় গন্তব্য।
চলুন, আমরা সবাই মিলে আমাদের পর্যটন খাতকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাই, যেখানে পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে বলবে, “চলো, ঘুরে আসি বাংলাদেশ!”
ধন্যবাদ সবাইকে, সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।


