ইরানের যে কৌশলে, আমেরিকার মাথা নষ্ট

কল্পনা করুন, রাতের আকাশ হঠাৎ শত শত আগুনের গোলায় ভরে উঠেছে। কোনো শব্দ নেই, কোনো আগাম সতর্কতা নেই—শুধু এক ঝাঁক যান্ত্রিক মৌমাছির মতো ড্রোন আপনার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন ফিল্ম নয়, বরং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের কঠোর বাস্তবতা। এই যে শত শত ড্রোন মিসাইল একসাথে ছোঁড়া হলো, এর পেছনে আসলে কী রণকৌশল কাজ করছে? আজ আমরা সেই ‘অ্যাটাকিং স্ট্র্যাটেজি’ বা আক্রমণের কৌশলগুলো সহজ করে বলব। 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরে-ই লেখা থাকবে । আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আর ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এ কাঁপছে পুরো দুনিয়া। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মৃত্যু আর পারমাণবিক স্থাপনায় একের পর এক হামলার পর অনেকেই ভেবেছিলেন ইরান হয়তো এবার চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু গত কয়েকদিন বিশ্ব অবাক হয়ে দেখছে—ইরান পাল্টা আঘাত হেনে আমেরিকান আর দোসরদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। 

পেন্টাগনের জেনারেলদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ; প্রশ্ন একটাই। আকাশপথে এত বড় বিপর্যয়ের পরও ইরান কীভাবে টিকে আছে? আজকের পর্বটি ইরানের সেই ‘গোপন রণকৌশল’ নিয়েই, যা সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান আর মিসাইল ডিফেন্সকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। 

এই কৌশলগুলোর পেছনের মূল শক্তিটা কী? ইরানের সামরিক শক্তির সবচেয়ে বড় মেরুদণ্ড হলো তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিশাল ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন আর্সেনাল, যা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বলে বিবেচিত। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী। তাদের রয়েছে ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (IRGC)-এর মতো একটি এলিট ফোর্স, যারা প্রথাগত সামরিক বাহিনীর বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। আকাশপথে তাদের হাতে রয়েছে ‘ফাত্তাহ’ (Fattah)-এর মতো হাইপারসনিক মিসাইলের প্রোটোটাইপ, যা শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেগে ছুটে গিয়ে রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। শুধু আকাশপথেই নয়, সমুদ্রেও তাদের ‘অ্যাসিমেট্রিক নেভাল ওয়ারফেয়ার’ (Asymmetric Naval Warfare) কৌশল বেশ ভয়ঙ্কর; যেখানে তারা পারস্য উপসাগর বা হরমুজ প্রণালীতে ছোট ছোট সশস্ত্র স্পিডবোট এবং সাবমেরিন ব্যবহার করে বড় বড় যুদ্ধজাহাজকে ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। দশকের পর দশক পশ্চিমা অবরোধের কারণে তারা বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে যে, আধুনিক বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে তারা এখন সামরিক সরঞ্জামে অনেক বেশি স্বাধীন।

বর্তমান যুদ্ধের বাস্তবতায় ইরানের প্রথম বড় চালটার নাম হলো ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’। সহজ বাংলায় বললে, শত্রুর ডিফেন্স সিস্টেমকে অনেকগুলো ছল চাতুরির মাধ্যমে ব্যস্ত করে ফেলা। আপনার হয়ত মনে থাকার কথা, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরান এক রাতেই ইসরায়েলের দিকে প্রায় ৩০০-এর বেশি ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে দেয়। এটিই ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলাগুলোর একটি। এর সাথে ইরান যোগ করেছে ‘ডিকয়’ বা প্রতারণার ফাঁদ। তারা আসল মিসাইলের সাথে আকাশে শত শত সস্তা, নকল ও রাডার-রিফ্লেক্টিং ডামি ছুঁড়ে মারে। উদ্দেশ্য হলো, ইসরায়েলের রাডার যেন আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হয় এবং নকল টার্গেটে তাদের দামি ইন্টারসেপ্টরগুলো খরচ করে ফেলে।

এখানে মূল খেলাটি হলো খরচের। রয়টার্সের তথ্যমতে, ইরানের একটি ‘শাহেদ’ ড্রোন বানাতে খরচ হয় ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ সেটি ধ্বংস করতে ইসরায়েলের ‘ইন্টারসেপ্টর’ এর পেছনে খরচ হয় প্রায় ৪০ লাখ ডলার! সস্তা ড্রোন পাঠিয়ে ইরান মূলত ইসরায়েলের দামী দামী মিসাইলগুলো আগেভাগে নষ্ট করিয়ে দিচ্ছে, যাকে বিশেষজ্ঞরা বলছে ‘Cost-Imposition Strategy’ বা অর্থনৈতিক চাপের যুদ্ধ । 

তবে ইসরায়েল ও আমেরিকাও কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের এই সস্তা ড্রোন আর ‘কস্ট-ইমপজিশন’ স্ট্র্যাটেজির পাল্টা জবাব দিতে ইসরায়েল নিয়ে আসছে ‘আয়রন বিম’ বা ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন, লেজার সিস্টেম। যেখানে একটা ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ছুঁড়তে লাখ লাখ ডলার লাগে, সেখানে লেজার দিয়ে আকাশে ড্রোন পোড়াতে তাদের খরচ হবে মাত্র কয়েক ডলার! এছাড়া তাদের রয়েছে দুর্ভেদ্য ‘থ্রি-লেয়ার্ড ডিফেন্স’ বা তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—কাছের শত্রুর জন্য ‘আয়রন ডোম’, মাঝারি দূরত্বের জন্য ‘ডেভিডস স্লিং’ এবং বায়ুমণ্ডলের বাইরে থাকা মিসাইল ধ্বংস করতে ‘অ্যারো-থ্রি’। এই নিখুঁত শিল্ড ভেদ করাই এখন ইরানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরানের আকাশপথের এই দাপট ধরে রাখার তুরুপের তাস হলো তাদের মাটির নিচে কয়েকশ মিটার গভীরে তৈরি ‘মিসাইল সিটি’। যা সাধারণ বিমান হামলায় ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি টানেল নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় লঞ্চ প্যাড দ্বারা সুসজ্জিত। সম্প্রতি ইরান তাদের সবথেকে শক্তিশালী ‘খোররামশাহর-৪’ (Khorramshahr-4) মিসাইলও এই আন্ডারগ্রাউন্ড সাইলোতে স্থাপন করেছে।

সামরিক শক্তির বাইরে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তাদের ‘ইন্টেলিজেন্স’ বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। তাদের প্রধান রণকৌশল হলো ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ বা নিখুঁত হামলায় শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া। অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজ, মোসাদের আন্ডারকাভার নেটওয়ার্ক এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে তারা শত্রুর গভীরে ঢুকে অপারেশন চালায়। তাদের কৌশলটা পরিষ্কার—মাথা কেটে ফেললে শরীর এমনিতেই অচল হয়ে পড়বে। আমেরিকা ভেবেছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আঘাত করলেই ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু ইরানের রণকৌশল সাজানো হয়েছে ‘বিকেন্দ্রীভূত’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, প্রধান কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হলেও প্রতিটি ইউনিট স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে এবং হামলা চালাতে পারে। এই কারণেই শীর্ষ নেতৃত্বের এতো বড় ক্ষতির পরও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন আর মিসাইল বৃষ্টি থামানো যায়নি।

এর পাশাপাশি চলছে প্রযুক্তিগত যুদ্ধ। একে বলে ‘জিরো-ডে হার্ডওয়্যার ভালনারেবিলিটি’। সিএনএন (CNN) দাবি করেছে, আমেরিকা আর ইসরায়েল মিলে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে ভাইরাস ঢুকিয়ে সিস্টেম অকেজো করেছিল, আবার ইরানও পাল্টা ইসরায়েলের ইলেকট্রিক গ্রিড হ্যাক করার চেষ্টা করেছে। একে বলা যেতে পারে ‘ডিজিটাল ব্ল্যাক ম্যাজিক’। 

সরাসরি আক্রমণের বাইরেও একটা বড় চাল হলো ‘প্রক্সি ওয়ার’। আল জাজিরার (Al Jazeera) তথ্যমতে, ইরান সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে তাদের মিত্র বাহিনী যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইয়েমেনের হুথিদের ব্যবহার করে একটি ‘রিং অফ ফায়ার স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করেছে। এটি মূলত একটি ‘অ্যাট্রিশন ওয়ার’ বা ধৈর্য যুদ্ধ। তারা জানে সরাসরি সংঘাতে জয় কঠিন, তাই তারা লড়াইটাকে দীর্ঘায়িত করে প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। 

বর্তমান যুদ্ধে ‘জিপিএস জ্যামিং’ এবং ‘স্পুফিং’ একটা বিশাল অস্ত্র। বিবিসি (BBC) বলছে, ইসরায়েল বা আমেরিকা পুরো এলাকার জিপিএস সিগন্যাল এলোমেলো করে ড্রোনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে দেয়। তবে প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে এখন যোগ হয়েছে অটোনোমাস বা এআই ড্রোন। বর্তমানে এআই টার্গেট শনাক্ত করতে সাহায্য করলেও, চূড়ান্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত এখনো মানুষের হাতেই থাকে, যাকে বলা হচ্ছে ‘Human-in-the-Loop’ ব্যবস্থা। 

সবশেষে একটা কথাই বলতে হয়, যুদ্ধ এখন আর শুধু গায়ের জোরের লড়াই নয়। এটা এখন প্রযুক্তি আর বুদ্ধির দাবা খেলা। এক পক্ষ চাল দিচ্ছে তো অন্য পক্ষ আগে থেকেই পাল্টা চাল তৈরি করে রাখছে। তবে এই খেলায় দিনশেষে সাধারণ মানুষের যে ক্ষতি হয়, সেই দায় কিন্তু কোনো দেশই নিতে চায় না। আর ক্ষতিটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরই সবচেয়ে বেশি। তাই আমাদের চাওয়া শুধু একটাই, এই যুদ্ধ এখনই বন্ধ হোক।  

ধন্যবাদ সবাইকে। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top