একটা গল্প বলি, শুনুন। ধরা যাক, তার নাম করিম সাহেব। গত রমজানে তিনি খুব নিয়ম মেনে রোজা রেখেছিলেন। ইবাদতও করছেন, ডায়েট হচ্ছে ভেবে মনটা খুব খুশি। কিন্তু রমজান শেষে ওজন কমার বদলে দেখা গেল তার ৫ কেজি বেড়ে গেল। করিম সাহেব একা নন, গল্পটা আসলে আমাদের অনেকেরই।
সবাইকে রমজানের শুভেচ্ছা।
রমজান মাসটা সংযমের মাস। মানে কম খাওয়া, কম ভোগ করা। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায়, রমজান শেষে ওজন কমার বদলে উল্টো বেড়ে যায়! গল্পের করিম সাহেবের মতো এমনটা কি আপনার সাথেও হয়েছে? ইফতারের পর মনে হয় পেটটা ফেটে যাবে, আর তারাবির নামাজে দাঁড়াতেই কষ্ট হয়? জানি, অনেকের সাথেই মিলে যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হয়?
আমাদের শরীর চলে মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ায়। যখন আমরা খাবার খাই, বিশেষ করে শর্করা জাতীয় কিছু, তখন পরিপাকতন্ত্র সেটাকে ভেঙে গ্লুকোজ বানায়। এই গ্লুকোজ রক্তে মেশার পর অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামক এক হরমোন নিঃসৃত হয়। ইনসুলিনের কাজ হলো রক্ত থেকে গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া, যেখানে সেটা শক্তিতে পরিণত হয়। এখন একটা মজার বিষয় বলি। দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে কিন্তু শরীর অলস হয়ে থাকে না। বরং তখন শরীরের কোষগুলো নিজেদের ভেতর জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় আর ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন ও টক্সিন পরিষ্কার করতে শুরু করে। ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি এই ‘সেলুলার ক্লিনিং’ বা কোষীয় পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়া আবিষ্কার করে নোবেল পেয়েছেন। শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। রোজা – এই প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ। তবুও আমরা কেন এই সুযোগটা নিতে পারি না?
কারণ আমরা “Fasting” বা রোজা রাখার বদলে “Feasting” বা ভোজ উৎসবে মেতে উঠি।
সারা দিন রোজা রেখে আমরা ইফতার শুরু করি এমন সব খাবার দিয়ে, যা শরীরে গিয়ে বিষের মতো কাজ করে। মাহে রমজানে এই একটা মাস যদি আপনি একটু সঠিক ফুড হ্যাবিট এবং লাইফস্টাইল মেনে চলতে পারেন, তাহলে পুরো মাসটাই হয়ে উঠতে পারে আপনার শরীরের জন্য সবচেয়ে বড় ‘ডিটক্স’ পিরিয়ড। আর যদি ভুল করেন? তাহলে ঈদের দিন হয়তো হাসপাতালেই কাটাতে হবে আপনাকে। তাই আজকের ভিডিওতে শুধু ইমোশন দিয়ে নয়, বিজ্ঞান আর ডেটা দিয়েই বুঝব, রমজানে আমাদের শরীরে আসলে কী ঘটে? আর সুস্থ থাকতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীরা ঠিক কী কী খেতে বলছেন। চলুন, গভীরে যাওয়া যাক।
আমাদের বাঙালি কালচারে ইফতার মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোলা, মুড়ি, বেগুনি, পিঁয়াজু আর জিলাপি। সাথে চিনি ভর্তি শরবত। আমরা ভাবি, সারাদিন তো না খেয়ে ছিলাম, এখন ডুবো তেলে ভাজা এই খাবারগুলো না খেলে কি আর পেট ভরে? কিন্তু বিজ্ঞান কী বলছে একটু শুনি।
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা WHO-এর একটি রিপোর্ট বলছে, রমজানে অসুস্থ হওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটা হলো এই ‘Deep Fried’ বা ডুবো তেলে ভাজা খাবার। সারাদিন উপোস থাকার পর আপনার পাকস্থলী থাকে অনেকটা বিশ্রামে। সেখানে আপনি হঠাৎ করে যখন প্রচুর ট্রান্স-ফ্যাট আর পোড়া তেল ঢেলে দেন, তখন আপনার হজম প্রক্রিয়া একেবারে শকড হয়ে যায়। আর ফলাফল? অ্যাসিডিটি, বদহজম আর ভয়ংকর ক্লান্তি। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা NHS-এর পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইফতারের সময় আমাদের শরীরের দরকার দ্রুত শক্তি বা এনার্জি। সেই শক্তি কিন্তু তেল-চর্বি দিতে পারে না। তা দিতে পারে সিম্পল কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা। তবে সাবধান, এক গ্লাস সাদা চিনি গোলা শরবত খেয়ে রক্তে সুগার লেভেল বা ইনসুলিন স্পাইক করাবেন না। চিনির বদলে ফলের ন্যাচারাল সুগার বা খেজুরের ওপর ভরসা রাখুন।
তাহলে ইফতারে কী খাবো? শুরুটা অবশ্যই হওয়া উচিত রাসুল (সা.) এর সুন্নাহ মেনে খেজুর দিয়ে। পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও খেজুর হলো “পাওয়ার হাউস অফ এনার্জি”। এতে আছে ন্যাচারাল সুগার, ফাইবার, পটাশিয়াম আর ম্যাগনেসিয়াম। সারাদিন শরীর যে গ্লুকোজ হারিয়েছে, মাত্র ২-৩টি খেজুর সেটা মুহূর্তেই পূরণ করে দেয়। এরপর পানি খেতে হবে, তবে ঢকঢক করে ২ লিটার পানি একবারে খেয়ে ফেলবো না। ব্র্যাক হেলথকেয়ারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার ফলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ইফতারের প্লেটটা সাজাতে হবে খুবই স্মার্টলি। খেজুরের পর পানি বা ঘরে বানানো চিনি ছাড়া ফলের জুস খেতে পারেন। এরপর তরমুজ, পেঁপে বা বাঙ্গির মতো পানিযুক্ত ফল রাখুন। সামান্য ছোলা থাকতে পারে, তবে সেটা যেন তেলের খনি না হয়। আর ওই যে বেগুনি আর পিঁয়াজুর মায়া, সেটা কাটানো কঠিন। তবে রোজ রোজ না খেয়ে, সপ্তাহে ১-২ দিন অল্প পরিমাণে খেতে পারেন। এটাকে প্রধান খাবার না ভেবে মাঝেমধ্যে জিহ্বার স্বাদ বদলানোর ট্রিট হিসেবে ধরুন।
আমরা অনেকেই ইফতারে এত বেশি খেয়ে ফেলি যে ডিনারটাই আর খাওয়া হয় না। এটা কিন্তু একটা বড় ভুল। মনে রাখবেন, ইফতার মানে শুধু উপোস ভাঙার নাস্তা। আপনার আসল খাবার বা মেইন মিল হবে রাতের বেলা। তারাবির নামাজের আগে হোক বা পরে হোক, সেটাই হবে প্রধান খাবার। আর সেখানে খেয়াল রাখতে হবে ব্যালেন্সড ডায়েটের দিকে। থাইল্যান্ডের মাহিডল ইউনিভার্সিটির পুষ্টি ইনস্টিটিউটের মতে, রোজার সময় প্রোটিন খুব জরুরি। কারণ প্রোটিন আপনাকে অনেকক্ষণ ক্ষুধামুক্ত রাখে, আর পেশীও ঠিক রাখে। তাই রাতের খাবারে লাল চালের ভাত বা লাল আটার রুটি রাখতে পারেন। এগুলো ধীরে হজম হয়, তাই অনেকক্ষণ শক্তি জোগায়। সাথে রাখুন এক টুকরো মাছ বা মুরগি। আর সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে প্রচুর শাকসবজি খাওয়া। রমজানে পানি কম খাওয়া হয়, তাই অনেকেরই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে। শাকসবজির ফাইবার বা আঁশ এই সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে।
এবার আসি সেহরিতে। সেহরিতে আমাদের অনেকেরই পছন্দ বিরিয়ানি, তেহারি বা খুব ভারী কোনো খাবার। আমরা ভাবি, এখন বেশি করে খেয়ে নিলে সারাদিন আর খিধেই লাগবে না। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং ভারী খাবার খেলে আপনার তৃষ্ণা পাবে বেশি। লবণের পরিমাণ বেশি থাকলে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে যাবে। সেহরির জন্য ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনের পরামর্শ হলো, এমন খাবার খেতে হবে যা “Slow Releasing Energy” দেয়। অর্থাৎ, যা পেটে অনেকক্ষণ থাকে এবং ধীরে ধীরে শক্তি যোগায়। যেমন ওটস বা দুধ-ভাত খেতে পারেন। অথবা লাল আটার রুটি আর সবজি – খুব ভালো অপশন। তবে সেহরিতে দই জাদুর মতো কাজ করে। এটি প্রোবায়োটিক, যা হজমে সাহায্য করে এবং তৃষ্ণা কমায়। আর একটা সতর্কবার্তা, সেহরিতে চা বা কফি পরিহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ ক্যাফেইন ডাই-ইউরেটিক, যা শরীর থেকে পানি বের করে দেয়। ফলে সারাদিন আপনার গলা শুকিয়ে আসতে পারে। একান্তই খেতে হলে খুব হালকা লিকারের এক কাপ চা চলতে পারে, তবে এড়িয়ে চলাই ভালো।
রমজানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। সূর্য ডোবা থেকে সূর্য ওঠা – এই সময়টুকু আপনাকে সারাদিনের পানির ঘাটতি পূরণ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রিকমেন্ড করে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। কিন্তু ইফতারেই ৫ গ্লাস খেয়ে ফেলবেন না। নিয়মটা হতে পারে খুব সাধারণ। ইফতারে দুই গ্লাস খেলেন, এরপর রাতের খাবারের সাথে আরও দুই গ্লাস। তারাবির পরে এক বা দুই গ্লাস এবং সবশেষে সেহরিতে আরও দুই গ্লাস পানি পান করলেন। এভাবে সময় ভাগ করে পানি খেলে কিডনির ওপর চাপ পড়ে না। একইসাথে শরীরও ডিহাইড্রেটেডও হবে না। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি বা লেবুর শরবতও খুব উপকারী। তবে সাবধান, বাজারের প্যাকেটজাত জুস বা কার্বোনেটেড কোল্ড ড্রিংকস থেকে দূরে থাকুন। এগুলো কেবল সুগার বাড়ায়, তৃষ্ণা মেটায় না।
খাবারের পাশাপাশি আরেকটা বিষয়ে নজর দিতে হবে। ঘুম এবং সামান্য হাঁটাচলা। রমজানে ঘুমের অনিয়ম মেটাবলিজম কমিয়ে দেয়, ফলে ওজন বাড়ে। তাই রাতে অন্তত ৪-৫ ঘণ্টা এবং দুপুরে সামান্য পাওয়ার ন্যাপ (Power Nap) নেওয়ার চেষ্টা করুন। আর ইফতারের পর একদম শুয়ে-বসে না থেকে ১০-১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করুন, এতে খাবার হজম সহজ হবে।
সবশেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, রমজান মাসটা শুধু না খেয়ে থাকার মাস নয়, এটি হলো আত্মশুদ্ধি এবং ডিসিপ্লিন প্র্যাকটিস করার মাস। আগেও বলেছি, জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি নোবেলজয়ী আবিষ্কার “অটোফ্যাজি”র (Autophagy) কথা। তিনি দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে শরীরের কোষগুলো নিজেদের মধ্যকার আবর্জনা বা টক্সিন বার্ন করে শরীরকে পরিষ্কার করে। রোজা হলো সেই অটোফ্যাজির সবচেয়ে বড় সুযোগ। কিন্তু আপনি যদি ইফতারেই ডুবো তেলের পেঁয়াজু-বেগুনি আর এক গাদা চিনি খেয়ে ফেলেন, তবে সেই ডিটক্স বা পরিষ্কার প্রক্রিয়াটি আর কাজ করে না।
তাই এবারের রমজানে একটা চ্যালেঞ্জ নিন। খাবার হোক পরিমিত, কিন্তু পুষ্টিকর। জিহ্বার স্বাদের চেয়ে শরীরের সুস্থতাকে প্রাধান্য দিন। দেখবেন, শুধু শরীর নয়, আপনার ইবাদতেও মনোযোগ বাড়ছে। ক্লান্তিহীন এক ফুরফুরে রমজান কাটছে আপনার। তবে মনে রাখবেন, যাদের ডায়াবেটিস বা কিডনির বিশেষ কোনো সমস্যা আছে, তারা ডায়েট পরিবর্তনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
সবাইকে আবারও পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা। ভিডিওটি আপনার পরিবার-বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন, বিশেষ করে যারা ইফতারে ভাজাপোড়া ছাড়া একেবারে চলতে পারেন না। ভালো কাটুক সবার রমজান।
ধন্যবাদ সবাইকে। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।
Promotion:
সারামাস রোজা রাখার পরও কি আপনার ওজন কমার বদলে উল্টো ৫ কেজি বেড়ে যায়? ইফতারের প্লেটে থাকা মুড়ি, বেগুনি আর জিলাপি দিয়ে আপনি নিজের অজান্তেই শরীরে বিষ ঢালছেন না তো? ঈদের দিনটা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে কাটাতে না চাইলে, বিজ্ঞান ও ডেটার ভিত্তিতে জেনে নিন রমজানে আপনার শরীরে আসলে কী ঘটে!


